পশ্চিম বঙ্গের পরিবেশ ও আমরা

পশ্চিমবঙ্গ ভারতের এমন একটি রাজ্য যার ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট অতুলনীয়। হিমালয়, সবুজ অরণ্য, আলপাইন অরণ্য, পর্ণমোচী অরণ্য, তরাই, ডুয়ার্স, গাঙ্গেয় উপদ্বীপ, রাঢ় ভূমি, বাদাবন, দীর্ঘ সমুদ্র তট ও বালিয়ারী, রয়েল বেঙ্গল টাইগার আর হাতি ও অন্যান্য বহু বন্য প্রানীর বাসভূমি এই বাংলা। এখানেই আছে সুন্দরবন, যা ইউনেস্কোর ওয়ার্লড হেরিটেজ সাইট আর এরাজ্যই ভারতের অন্যতম ঘন বসতী পূর্ণ রাজ্য, যার মাথাপিছু আয় বেশ কম। অথচ এত গহীন দারিদ্র সত্বেও এরাজ্যের ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে সামাজিক বৈষম্যের হার যথেষ্ট কম, জন্মের হার বা ফারটিলিটি রেট, শিশু মৃত্যুর হারও হাজারে চল্লিশের নীচে, যা সর্বভারতীয় মানের চেয়ে ভাল। এই সেই রাজ্য যেখান থেকে বৃটিশ ভারতের উত্থান ঘটেছে, স্বাধীনতা সংগ্রামেরও। পশ্চিমবঙ্গেই স্বাধীন ভারতের প্রথম পূ্র্ণাঙ্গ পরিবেশ দপ্তর স্থাপিত হয়। রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর ও রাজা রামমোহনের মতো উদার মানবতাবাদী ও স্যার জগদীশ চন্দ্র বোস, গোপাল ভট্টাচার্য্য, হ্যামিলটন, ডেভিড হেয়ার, জর্জ বেথুন ও উইলিয়াম রক্সবার্গের কর্মভূমি এই বাংলা ও তার পরিবেশ প্রকৃতি আজ ভাল নেই। বাংলার পরিবেশের সম্পূর্ণ আমাদের তৈরী করা ভয়ানক সমস্যাগুলির দিকে আসুন আমরা দৃষ্টিপাত করি। এর উদ্দেশ্য একটাই সংবেদনশীল, বৈজ্ঞানিক মননশীলতা ও উঁচুমানের মানবিক মূল্যবোধের নিরিখে আমরা সবকিছু বিচার করার চেষ্টা করবো। একই সাথে আমরা এটাও আশা করবো যে বিশুদ্ধ জল, বাতাস, মাটি, বনভূমি, পাহাড়, ম্যানগ্রোভ, তটরেখা, সমুদ্র ও জৈব সম্পদের সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধি আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও মানবাধিকার সূচক ও এর সংরক্ষণ ও ক্ষয় রোধের মাধ্যমে গরীব ও প্রাকৃতিকভাবে সম্পদশালী দেশ ভারতের ও এ রাজ্যের মানুষের জন্য প্রকৃত অর্থের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব, নচেৎ কোনভাবেই নয়, সেটি আমরা স্বীকার করি ও এই ভাবনাকে প্রকৃত অর্থেই সম্মান করি।

১). বড় ও প্রাচীন গাছ সংরক্ষণ করে উন্নয়ন, কেটে নয়:
মহিরুহ সমান বৃক্ষ রাজি যে আমাদের বিপুল পরিমান অক্সিজেন প্রদান করে ও ক্ষতিকর কার্বন হ্রাস করে তাই নয়, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, ভুমিক্ষয় রোধ, জৈব বৈচিত্র্য ও পৌরসভার রাস্তা গুলিকে ও সড়ক গুলিকে বৃষ্টি ও জলের অভিঘাত থেকে রক্ষাও করে। রাস্তা চওড়া বা ব্রিজ বানানোর নাম করে ক্রমাগত বড় বড় গাছ কেটে ফেলা একটি মারাত্মক ক্ষতিকারক প্রক্রিয়া যার ফলে অন্যান্য বিষয়ের সাথে সাথে সাংঘাতিক ভাবে বেড়ে চলে তাপ-আধার ( Heat Sink) তৈরীর প্রক্রিয়া, এর ফলে এলাকার তাপমাত্রা ভয়ানক ভাবে বেড়েই শুধু যায় না একটি বিশেষ ধরণের প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনে যার ফলে হঠাৎ করে বিপুল পরিমান আঞ্চলিক বৃষ্টি বা cloud burst তৈরী হতে পারে, যা ডেকে আনে প্রচুর ক্ষয় ক্ষতি। শুধু তাই নয় বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা এটা প্রায় নিশ্চিত করেছে যে পরিবেশ দুষণ বৃদ্ধি র সাথে বজ্র বিদ্যুৎ সহ প্রাক বর্ষার বৃষ্টির পরিমান বেড়েছে এবং বড় গাছের পরিমান কমায় তা অনেক বেশী মাটিতে পড়ছে ও প্রানহানী ঘটাচ্ছে। আর ঠিক যখন এই লেখা তৈরী হচ্ছে, সমস্তরকম পরিবেশ বিধি, বিশেষ করে ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রি (অ্যামেন্ডেড) এ্যাক্ট ফর নন ফরেষ্ট এরিয়া, ২০০৬ কে উল্লঙ্ঘন করে নির্বিচারে উন্নয়ন ও রাস্তা তৈরীর নামে মহিরুহ সমান প্রাচীন গাছ গুলিকে কেটে ফেলা চলেছে, গোটা রাজ্য জুড়ে। এই সকল গাছের পরিবেশ দূষণরোধ,তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ভূমিক্ষয় রোধ, পরিবেশের ভারসাম্য ও জৈব বৈচিত্র্য রক্ষায় যে অভূতপূ্র্ব অবদান সেই কথা মাথায় না রেখে এই কাজ করা হচ্ছে। আমাদের দাবী এই কাজ এখনি বন্ধ হোক। এই বিষয়ে আমরা পশ্চিমবঙ্গের দূষণ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর ও বনদপ্তরের নিষ্কৃয়তার তীব্র সমালোচনা করি ও দেশের পরিবেশ আইন ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে যেখানে কোন উপায় নেই একমাত্র সেখানেই উপযুক্ত বিকল্প যেমন, ট্রান্সপ্লান্টেশন, মাঝখানে গাছ রেখে দুইদিকে রাস্তা করা, টিবিএম মেশিন ব্যবহার করে মাটির উপরিতল অবিকৃত রেখে টানেলিং করে রাস্তা করার বিষয়ে সরকার কে অবহিত করার আবেদন জানাই। একই সাথে পিডব্লুডি দপ্তরকে আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই পরিবেশ ধ্বংসকারী কাজগুলি হতে বিরত হওয়ার ও উপরিক্ত বিষয়গুলি মাথায় রেখে পদক্ষেপ করার দাবী জানাই।
২) যশোর রোডের গাছ গুলিকে হেরিটেজ ঘোষণা করা:
রাস্তা চওড়া ও রোড ওভার ব্রিজ তৈরীর নাম করে পিডব্লুডি, যা একটি সরকারী সংস্থা, যশোর রোডের শতাব্দী প্রাচীন গাছ গাছ গুলি কে কাটার তোড়জোড় করছিল কিন্তু আদালত ও মানুষের প্রতিরোধে থমকে গেছে। আমরা চাই কোন প্রকার কালক্ষেপ না করে এবং আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক ও বাস্তুতান্ত্রিক গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে বারাসাত থেকে বনগাঁর পেট্রাপোল সীমান্ত পর্যন্ত রাস্তা ও রাস্তার দুই ধারে শতাব্দী প্রাচীন গাছ গুলি কে হেরিটেজ হিসাবে ঘোষণার মাধ্যমে, তাদের রক্ষণাবেক্ষণ ও কমিউনিটি ফরেষ্ট হিসাবে তাদের সংরক্ষণের বন্দোবস্ত করতে হবে। এর ফলে এলাকার বাস্তুতন্ত্রের শুধু উন্নয়ন হবে না, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির ফলে ট্যুরিজম ইত্যাদির ফলে এলাকার প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটবে।
৩) পূর্ব কলকাতার জলাভূমিকে রক্ষা করা:
পূর্ব কলকাতার জলাভূমি, যা ওয়েস্ট ওয়াটার বা শহরের দূষিত জল কে প্রাকৃতিক ভাবে পরিশোধন করার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জলাভূমি ও আন্তর্জাতিক ( রামসার সাইট) ভাবে সে কারেণই স্বীকৃত ও এক কথায় কলকাতার গর্ব। এই জলাভূমি আজ অবৈধ নির্মাণ ও অতিরিক্ত জলদূষণের কবলে। আমাদের দাবী কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশ অনুসারে যে নন ডেভলপমেন্ট যোন নির্দিষ্ট করা আছে তার কোন রূপ বদল করার চেষ্টা সরকার কড়া হাতে দমন করুক। দূষণ সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রস্তুত করা হোক। রাজ্য পরিবেশ দপ্তর, মৎস্য দপ্তর, ইস্ট কলকাতা ওয়েট ল্যান্ড অথরিটি ও রাজ্য সরকারের কাছে আমাদের দাবী তাঁরা এখনি এবিষয়ের রাজ্যের সবচেয়ে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে এই জলাভূমি রক্ষার কাজে ব্রতী হোন এবং কোন প্রকার স্বল্পমেয়াদি লাভ যেমন উড়ালপুল ইত্যাদির আগ্রাসন থেকে একে রক্ষা করুন।
৪) এলাকার পুকুরগুলির প্রাকৃতিক ভাবে সংরক্ষণঃ-
পৌর সভাগুলি ও কলকাতায় পুকুর গুলি বুজিয়ে বাড়ি তৈরীর চক্রান্ত নতূন নয়। পুকুর সংরক্ষণের নাম করে পুকুর বাঁধিয়ে দেওয়ার প্রবনতাও পৌরসভাগুলির একটি খারাপ অভ্যাস। এটা একটি পরীক্ষিত সত্য যে পুকুর বাঁধিয়ে দিলে পুকুরগুলি চৌবাচ্চাতে পরিণত হয়ে এগুলি শুধু মাত্র দুষিত জলের আধারে পরিনত হয়। এটা কোন ভাবেই কাম্য নয়।এই পুকুর গুলির গুরুত্ব, জলবায়ু, পরিবেশ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, অগ্নিনির্বাপক, ও এলাকার মানুষের জলের প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে অপরিসীম। আমাদের দাবী এই সকল জলাধার মৎস্য চাষ ও প্রাকৃতিক জলবাগান হিসাবে সংরক্ষন হোক। মৎস্যদপ্তর এই বিষয়ে নোটিস দিন ও এলাকা ভিত্তিক পুকুর সংরক্ষণ কমিটি গঠনের কাজে স্থানীয় সংগঠন ও এন. জি. ও গুলি কে যুক্ত করুক।
৫). ভবা দিঘীর মতো বড় দিঘী বা বিলের সংরক্ষণঃ-
মৎস্যদপ্তর ভবা দিঘী সহ রাজ্যের সকল বিল গুলি সংরক্ষণ করুন। রেল লাইন, রাস্তা ও সকল প্রকার ইনফাস্ট্রাকচার ডেভলপমেন্টের হাত থেকে জীবন জীবিকা ও পরিবেশের স্বার্থে এগুলি কে রক্ষা করা সরকার ও মৎস্যদপ্তরের প্রধানতম দায়িত্ব তা আমরা তাদের মনে করাতে বাধ্য হচ্ছি এবং এ বিষয়ে সদর্থক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবী জানাচ্ছি। এই ধরনের অনেক বিল যেখানে নলখাগড়া, শর এসবের বন আছে সেগুলি অতি বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মেছো বিড়াল বা বাঘরোলের আবাসস্থল, যা পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপ্রাণী। তাই এগুলির সংরক্ষণ আসু প্রয়োজন।
৬) সুন্দরবনের নদীবাঁধ পুনর্গঠনের কাজে স্বচ্ছতা:
সুন্দর বনের আয়লা স্টিয়ারিং কমিটির নির্দেশে যে Sundarban Embankment Reconstruction এর যে কাজ চলছে সে ব্যাপারে শ্বেতপত্র প্রকাশ করুক সরকার। বিপুল পরিমান অর্থ ব্যয়ে যে বাঁধ তৈরী হচ্ছে তার মেটেরিয়াল কি, টেনডার প্রক্রিয়া ও যারা কাজ করছেন তাদের এই ধরনের কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা মানুষের সামনে প্রকাশ করুক। পলিপ্রপিলিন সিট এর উপর সিমেন্ট-ব্রীক পীচিং করা এই বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়ে নিরপেক্ষ বিশেষঞ্রা স্পস্টতই সন্ধিহান (সূত্র ডাউন টু আর্থ ও পারসোনাল কমিনিকেশন) এবং আমরা জানি অতীতে এই ব্রীক পিচিং এর কি হাল হয়েছে। কি কারনে জিও জুট, চাটাই ও বাদাবনের ত্রিস্তরীও পাঁচিলের মতো প্রাকৃতিক ও পরিবেশ বান্ধব বস্তুগুলিকে বাদ দিয়ে সুন্দরবনে এই ধরনের কাজ চলছে একথা উত্তর সুন্দর বন ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের কাছেও আমরা চাইছি।
৭) সুন্দরবনে অবৈজ্ঞানিক মৎস্যচাষ রোধ, মৎস্যজীবিদের অধিকার রক্ষা, বাঘ ও বাদাবন সংরক্ষণে এলাকার মানুষের অধিক অংশগ্রহণ ও বন অধিকার আইনের প্রয়োগ:
সুন্দর বনের মৎস্যজীবিদের একদিকে যেমন অতি মিহি আড় জাল ব্যবহারের উপর কোন নিষেধাজ্ঞা সেরকম ভাবে আরোপিত হয় নি এত বছরেও, এদিকে কোন প্রকার বিকল্প কর্ম সংস্থান ছাড়া ক্রমশ বেড়ে চলা মৎস্যজীবিদের, যাদের অধিকাংশই এখন কাঁকড়া ধরা, গহীন বনের বা কোর এরিয়ায়, বনকর্মীদের কিছু সুলব রোজগারের পথের সুযোগ তৈরী করে, অবাধ প্রবেশ আর বাঘের হাতে নথিহীন মৃত্যু অব্যাহত। বিকল্প অর্থনীতির কোন রুপ দিশা না তৈরী করে আমরা সুন্দর বনকে কেমন করে এই সর্বগ্রাসী দূর্নীতির হাত থেকে বাঁচাবো। আমাদের দাবি বায়োস্ফিয়ারের নীতি ও আদর্শ অক্ষুন্ন রেখে ও রাইট টু ফরেস্ট অ্যক্টের সঠীক প্রণয়নের মাধ্যমে সুন্দরবন উন্নয়ন দপ্তর ও বনদপ্তর মিলে মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগের বৃদ্ধি করুক ও জঙ্গলের উপর চাপ কমাক। শুধু বন্দুক ও কলোনিয়াল অত্যাচারের মাধ্যমে জঙ্গল রক্ষার চেষ্টা এক ভুলে ভরা প্রাচীন পদ্ধতি। জঙ্গলের রক্ষার ক্ষেত্রে সুন্দরবনের মানুষের, বিশেষ করে মৎস্যজীবি ও মৌলীদের সরাসরি অংশ গ্রহণ, পারমিটের সংখ্যা নির্দিষ্ট স্থানে ধরে রেখে কোর ও বাফারের কোন সীমারেখা না তৈরী করে, ওই নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ কে কাঁকড়া, মাছ ও মধু আহরণের ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হবে। যেহেতু এই সংখ্যা ক্রমবর্ধমান নয় এবং বিকল্প সামনে এলে সংখ্যা আরও কমে এসে মূল জঙ্গলের উপর চাপ কমে আসবে। একই সাথে এই প্রকার সকল মৎস্যজীবি ও মৌলিরা যাতে বাঘের কামড়ে আহত ও নিহত হলে সব সুবিধা পায় এটাও আমরা দাবী করি। নথীভুক্ত মৎস্যজীবি ও মৌলিদের ইনসুরেন্সের নাম মাত্র প্রিমিয়াম, দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কোর, বাফার বিচার না করে দ্রুত ক্লেইম পেতে সাহায্য করা, স্বাস্থ্য বিমা ও বার্ধক্যভাতা এসব গুলো স্বাধীনতার এতো বছর পরেও না চালু হওয়া এ রাজ্যের ও দেশের লজ্জা। এটা বন দপ্তর, সুন্দরবন দপ্তর ও জেলা পরিষদের দায়িত্ব। এবং কেন তারা এতে ব্যর্থ হচ্ছেন সেটা দেশের সাধারন মানুষের সাথে সাথে আমরাও জানতে চাই। সুন্দর বনের হত দরিদ্র প্রান্তিক মানুষদের জীবন ও জীবিকা, জীবনের অধিকার কে ব্যাহত করে যে বাদাবন ও বাঘ কোনটাই সংরক্ষণ করা যায় না একথা আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই।
৮) সুন্দরবনে ট্রলার ও ট্রলনেটের ব্যবহার সীমাবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করা:
গঙ্গা ও সুন্দরবনের জলের বাস্তুতন্ত্র, মাছ ও প্রান্তিক মৎস্যজীবিদের বাঁচাতে এখনি কড়া হাতে ট্রলারের সংখ্যা ও ট্রল নেটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করুন সরকার। ট্রলারের সংখ্যা এখন এমন একটা সংখ্যায় পৌছেছে, যে উপকূলবর্তী মৎস্য ভান্ডার ও উপকূল ও নদীর তলভাগ প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে বসেছে। প্রায় নিশ্চিহ্ন গঙ্গার শুশুক, কামট, ইরাবতী ডলফিন, ও ফিনলেস পরপয়েস।ইলিশ সারা বছর মিষ্টি জলে বসবাস করছে। এ সমস্ত তথ্য মৎস্য দপ্তরের কাছে আছে। আমরা জানতে চাই এ বিষয়ে তারা কি ভাবছে??
৯). ট্যুরিজম ও ইকোট্যুরিজমের নামে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আশেপাশে যত্রতত্র রিসর্ট ও লজ গজিয়ে ওঠা বন্ধ করা:
সুন্দরবন ও পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত প্রধান সংরক্ষিত বনাঞ্চলের একটা বড় সমস্যা মাত্রাহীন ভাবে বাড়তে থাকা লজ ও রিসর্ট। মুর্তি, বক্সা, পাাখিরালা, ঝড়খালি জঙ্গলকে পিকনিক স্পটে পরিনত করেছে। ঠিক যেমন হয়েছে ট্রলারের ক্ষেত্রে, এখানেও এই সবের মুল অর্থনৈতিক লাভ থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বঞ্চিত অরণ্যের মানুষ। একদিকে প্রান্তিক মানুষের অবস্থার কোন উন্নতি ঘটছে না, ওদিকে অরণ্যের উপর বিপুল ভাবে বাড়তে থাকা ডিজেল চালিত বাহন, রাতের আলো ও দূষিত জল ও কঠিন বর্জ্যের ব্যাপক দূষণ কখনওই ইকোট্যুরিজমের উদাহরণ হতে পারে না। আমাদের দাবী এবিষয়ে বনদপ্তর কি কোন তথ্য রাখছেন, ভাবছেন কোন পরিবেশ বান্ধব বিকল্প? এক দিকে আদিবাসী ও বনচারী মানুষ কে লাঠি ও বন্দুক দিয়ে ভয় দেখানো আর একদিকে পয়সা ও ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার করে বনাঞ্চলকে শহুরে ব্যবসায়ীদের হাতে বিকিয়ে দেওয়ার এই প্রক্রিয়ার আমরা তীব্র নিন্দা করি। আমাদের মতে এসবই ওয়াইল্ড লাইফ প্রোটেকশন এ্যাক্ট ও ফরেস্ট রাইট এ্যাক্ট এর পরিপন্থি। এ ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের বনদপ্তরের বন্যপ্রাণী শাখার কাছ থেকে আমরা জবাব দাবী করি।
১০). লাটাগুড়ি ও গজলডোবায় বড় মাপের পরিবেশ ধ্বংসকারী প্রকল্প হতে বিরত থাকাঃ-
এখনি লাটাগুড়িতে গরুমারা জাতীয় উদ্যান লাগোয়া অঞ্চলে বৃক্ষছেদন ও গজলডোবার বিরাট মাপের পর্যটন প্রকল্প বন্ধ করতে হবে। গজলডোবা হাতি ও পরিযায়ী পাখি ও ক্ষুদ্র মৎস্যজীবিদের আবাসস্থল। আর লাটাগুড়ির যে অংশে গাছ কাটা হচ্ছে তা গরুমারা জাতীয় উদ্যানের অংশ। এবং Forest Conservation Act 1980 ও এই আইনের 2010 সালের নোটিফিকেশন অনুযায়ী জাতীয় বন্যপ্রাণী পরিষদের বিশেষ অনুমতি ছাড়া এখানে কোন মতেই এতো বড় বন সংরক্ষণের কারণ ব্যতিরেকে গাছ কাটা যায় না।
১১) পরিবেশ সুরক্ষায় বালি ও পাথর খাদানের উপর জোরদার নিয়ন্ত্রণ আনা:
বালি ও পাথর খাদান ও নদীর চড়ে যত্র তত্র গজিয়ে ওঠা ইঁট ভাটা বন্ধে এবং এই সমস্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসনের ব্যাপারে সরকারের (দূষণ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর ও শ্রমদপ্তর) নির্দিষ্ট উত্তর চাই আমরা। খাদানে কাজ করে সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত শ্রমিকদের জন্য একটি পূ্র্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরিকল্পনা সরকারের কাছে দাবী করি আমরা।
১২) রাণীগঞ্জ, আাসানসোল অঞ্চলে ওপেন কাস্ট কোল মাইন, আগুন, দূষন বন্ধ করতে সদর্থক পদক্ষেপ গ্রহণ করাঃ-
রাণীগঞ্জ, আাসানসোল অঞ্চলে ওপেন কাস্ট কোল মাইন, আগুন, দূষণ ও ধ্বস এক নিয়মিত ঘটনা। প্রকৃতপক্ষে এটি একটি মানুষের তৈরী অন্যতম বৃহৎ বিপর্যয় যা ঝাড়খন্ডের মূল খনি অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। এখন পর্যন্ত সরকার এই বিষয়ে দিশাহীন। গোটা এলাকা ধ্বংসের দিন গুনছে। আমরা সমস্ত ওপেন কাস্ট মাইন বন্ধ করে সমস্ত সংগঠিত ও অসংগঠিত শ্রমিকদের পুনর্বাসন দাবী করি।
১৩) আর্সেনিক ও ফ্লোরাইড দূষণ নিয়ন্ত্রণঃ-
পশ্চিমবঙ্গ একটি আর্সেনিক ও কোন কোন অঞ্চলে ফ্লোরাইড আক্রান্ত। আর আমরা জানি এর মূল উৎস ভৌম জল। অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে চাষের কাজে ঢালাও ভৌম জল ব্যবহারের ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে। কি ভাবে এই ভয়ানক জল দূষণের হাত থেকে আমরা মুক্তি পাব এবং কি হবে রাজ্যর লক্ষ লক্ষ আর্সেনিক ও ফ্লোরাইড আক্রান্ত মানুষের সুরাহার রাস্তা, তা গবেষনা পত্র ও সরকারি নথিতে আটকে আছে। রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর, কৃষি ও সেচ দপ্তরের কাছে আমাদের দাবী তারা এই জলদূষণের কথা মাথায় রেখে ভৌম জল নীতির সম্পূর্ণ পরিবর্তন করুন ও রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের মাধ্যমে আর্সেনিক ও ফ্লোরাইড আক্রান্ত রুগিদের জন্য একটি জনস্বাস্থ্য প্রকল্প ঘোষণা করুন।
১৪) জল, বায়ু, শব্দ, প্লাস্টিক, কঠিন বর্জ্য ও ই- বর্জ্য নিয়ন্ত্রণঃ-
বায়ু দূষণ ও প্লাস্টিক দূষণ এক সর্বাধিক চর্চিত বিষয়। কাটা তেল, ডিজেল, ভুয়ো ধোঁওয়া চেক করা এবং অবৈধ যান যেমন ভ্যানো ইত্যাদির রমরমা ও ক্রমাগত বাড়তে থাকা গাড়ির সংখ্যা, মাত্রা ছাড়া কঠিন বর্জ্য পোড়ানো, বেআইনী প্লাস্টিক কারখানার ধোঁওয়া এ সবই কলকাতা ও পশ্চিম বঙ্গের শহরতলি গুলোকে দূষণের রাজধানী করে তুলেছে। আর এদিকে প্লাস্টিক প্যাকেট, থার্মোকলের থালা বাটি, প্লাস্টিকের স্ট্র, পেট বোতলের রমরমা আমাদের চারিদিকে। মনে রাখতে হবে আমাদের আছে শক্ত বায়ু দূষণ আইন, কঠিন বর্জ্য, ও প্লাস্টিক ব্যাগ ও রিসাইকেল প্লাস্টিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন। আর এসবের নিয়ামক সংস্থা, রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর। একথা খুব কম করেও বলা যায় এই সংস্থার বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত হতাশাজনক। কারন বায়ু, প্লাস্টিক ও শব্দ দূষণের মতো গুরুতর ও পরিবেশ দূষণের নিয়ন্ত্রণের এই ন্যূনতম শর্তগুলি পূরণ করতে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। প্লাস্টিক দূষণ রোধে যেমন ইকো ব্রিকের মতো বিকল্প নিয়ে ভাবা দরকার, তেমনি পচনশীল কঠিন বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি পৌরসভায় বায়ো গ্যাস, কম্পোস্ট ও ভার্মি কম্পোস্ট প্রকল্প নিয়ে জরুরী ভিত্তিতে ভাবা দরকার। ই বর্জ্য ও ক্ষতিকর বর্জ্য বা হ্যাজারডাস ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট এর ক্ষেত্র প্রশাসনিক ও কারিগরি দূর্বলতা কাটিয়ে উঠতে গেলে বহুমুখি প্রকল্প দরকার, যা নিয়ে সরকারের কাছ থেকে সদর্থক পদক্ষেপ আমরা আশা করি যা জনমুখি ও কম খরচ সাপেক্ষও বটে।একই কথা খাটবে জল দূষণের ক্ষেত্রেও, বিশেষ করে হুগলী নদীর জল দূষণ ও বিদ্যাধরীর দূষণের ক্ষেত্রেও।জল দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন, পরিবেশ দূষণরোধী আইন, গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান সব কিছুই এই দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ।হ্যাঁ এটা ঠিকই যে শ্মশান ঘাটের ইলেক্ট্রিক চুল্লি ও ঠাকুর ভাসানের সময়কার নিয়ন্ত্রন গুলি কিছুটা সঠিক প্রভাব ফেলেছে কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণের তুলনায় অত্যন্ত স্বল্প। আমরা গঙ্গার ক্ষেত্রে অন্য রাজ্যগুলি থেকে আসা দূষণের কথা বলতে পারি, কিন্তু বিদ্যাধরীর ক্ষেত্রে সে কথা খাটে না। বিদ্যাধরীর দূষণ সম্পূর্ণ ভাবে কলকাতা শহরের ও ট্যানারীর দূষিত জল পুষ্ট। কলকাতা শহরের ও ট্যানারি ও প্লাস্টিক রিসাইক্লিং এর ভয়ানক বর্জ্য নিয়ন্ত্রনে সরকার কি পদক্ষেপ করছে তা মানুষকে জানানো সরকারের অবশ্য কর্তব্য।
১৫) হাতির মৃত্যু ও হাতির সংরক্ষণঃ-
পশ্চিম বঙ্গের উত্তর, বিশেষ করে দার্জিলিং জেলার নীচের অংশ, জলপাইগুড়ি জেলা ও দক্ষিণবঙ্গের বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা মানুষ ও হাতির সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে আজ বহু বছর হলো। এর মূল কারণ বহু জটিল। কিন্তু মূলত হাতির চলাচলের রাস্তা বা করিডরে তৈরী হওয়া মানুষের বসতি, রাস্তা, রেল লাইন, আসামের দিকে উগ্রবাদী কাজ বৃদ্ধি ও জঙ্গল হ্রাস পাওয়ার ফলে হাতির দলের ফিরে না যাওয়া, একই ভাবে ঝাড়খন্ড ও ওড়িষ্যা থেকে আসা হাতির ফিরে না যাওয়া, হাতির প্রাকৃতিক খাওয়ার নষ্ট হওয়া ও হাতির জঙ্গলের লাগোয়া গ্রামের পুষ্টিকর চাষের ধান, ভূট্টা, আঁখ এসবে অভ্যস্থ হয়ে পড়া। হাতির আক্রমণে মানুষের মৃত্যু এক অতীব দুঃখ জনক ঘটনা। কিন্তু তার অধিকাংশই ঘটে হাতির কোনঠাসা হয়ে পড়া বা অকারণে বা ঘরে পচানো মদের ঘোরে মানুষের অত্যাধিক নৈকট্যর কারণে। কিন্ত হাতি মরছে নির্বিচারে। গভীর রাতে ট্রেনের তলায়, ট্রাকের ধাক্কায়। সংরক্ষিত জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলা রেলের রাস্তা আর পীচের রাস্তা নিত্য হাতি শিকার করে চলেছে। আমরা কি করবো!! এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। হাতি নিয়ে কম কাজ হয় নি। এবং সমস্ত রিপোর্ট গুলি কিন্তু বনদপ্তর, রেল, জেলা প্রশাসন, চায়ের বাগান, পঞ্চায়েতের সমন্বয়, পরস্পর কে সাহায্য করা, মানুষ কে হাতি সম্পর্কে সচেতন করা, হাতির খাবারের জন্য চাষ, হাতির করিডোর রক্ষা করা ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রেলগাড়ি ও গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং হাতি জঙ্গল থেকে লোকালয়ে এলে লোক জমতে না দেওয়া এবং হুলা পার্টিকে নিয়ন্ত্রণ করা এসবের দিকেই দিক নির্দেশ করেছে।
কিন্তু এতসব সত্বেও হাতি মৃত্যু ও সংঘর্ষ কমে নি। হাতির মতো একটি অসাধারণ প্রাণী যাকে বিজ্ঞানীরা কি-স্টোন স্পিসিস বলেন ও যা ভারতের ঐতিহ্য ও গর্ব তা আমাদের বুঝতে হবে। এবিষয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সকল জরুরী দপ্তর গুলির কাছ থেকে আমরা আরও গঠনমূলক কাজ আশা করি এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতা কামনা করি। কিন্তু হাতির জন্য ফসল ও জীবন নষ্ট হলে যদি আমরা ঠিক সময়ে সরকারি সাহায্য না পৌঁছে দিতে পারি তাহলে সাধারণ গরীব মানুষের কাছ থেকে কোন রুপ সহযোগিতা পাব না ও হাতি কে রক্ষা করা কঠীন হয়ে পড়বে একথা বনদপ্তর কে মনে রাখতে হবে।
১৬) জৈব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ:–
ভারত একটি বৃহৎ জৈব বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ বা মেগা বায়ো ডাইভারসিটি কান্ট্রি। ইউনাইটেড নেশন এর নির্দেশ অনুসারে জৈব বৈচিত্র সংরক্ষণের জন্য আলাদা আইন ও ন্যাশানাল বায়োডাইভারসিটি রেজিস্টার তৈরী করেছি আমরা। জৈব সম্পদ মানুষের ও প্রকৃতির বেঁচে থাকার সম্বল। বহু প্রজাতির হারিয়ে যাওয়া ধান, ঔষধি গাছপালা, কীট, পতঙ্গ, মাকড়সা, প্রজাপতি, ফড়িং, অসংখ্য প্রজাতির স্বাদু ও নোনা জলের মাছ, স্বাদু ও নোনাজলের কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক, মৌমাছি, উভচর, ভাম বিড়াল, নেউল, বেজী, তক্ষক, বহু প্রজাতির পাখি আমাদের প্রকৃতি ও বসবাসের স্থানের ধ্বংসের কারণে হারিয়ে গেছে ও হারিয়ে যেতে বসেছে। এব্যাপারে আমাদের অনেক সচেতনতা চাই। সবচেয়ে জরুরী হলো আহরিত তথ্য মানুষ কে জানানো। আমাদের দাবী রাজ্যর বন, পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য সব দপ্তর নিজ নিজ ক্ষেত্রের জৈব ভান্ডার গুলির সচিত্র পরিচয় লিপি বানিয়ে গ্রামে, শহরে প্রচার করুন। এবিষয়ে যে সংগঠন গুলি বা এন জি ও কাজ করছে বা কাজ করতে আগ্রহী তার সমন্বয় সাধন হোক। জৈবসম্পদ রক্ষায় সেটি একটি বৃহৎ পদক্ষেপ হবে।

১৭) নদী ভাঙন ও নদী বিলুপ্তি:–
আমরা সকলেই জানি হুগলি ও ভাগিরথী অতি ক্ষয়প্রবণ নদী এবং সেটা অনেকটাই ভূপ্রাকৃতিক কারণেই, তবে সেটা যে ফারাক্কার পরে অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে সেটা প্রায় সকল নদী বিশেষজ্ঞ স্বীকার করে নেন। মুর্শিদাবাদ, মালদা ও নদীয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই ভাঙ্গনের প্রকোপে। কাজ, জীবন, জীবিকা হারিয়ে পথে বসেছেন, বসছেন শত শত মানুষ। তার মধ্যে শান্তিপুরের বিখ্যাত তাঁত চাষীরাও আছেন। অথচ প্রতি বছর বালির বস্তা সহযোগে কিছু জোড়াতালি প্রদান ছাড়া কোন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, সঠিক পুনর্বাসন, ভাঙন রোধে সুদুর প্রসারী কোন পরিকল্পনা, যেমন ভাঙ্গনসঙ্কুল অঞ্চল গুলিতে নদীর স্রোত বিচার করে, ভাঙ্গা গড়ার প্রকৃতি বিচার করে আধুনিক ও পরিবেশ-বান্ধব পদ্ধতি অবলম্বন করে ভাঙ্গনরোধী বাঁধ নির্মাণ দরকার, এসব আমরা দেখতে পাচ্ছিনা। নদীভাঙ্গন পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান এবং কোন কোন মতে সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়। আমাদের দাবী এটি একটি জাতীয় বিপর্যয় তা ঘোষণার অপেক্ষা রাখে না। রাজ্যের সেচ, ত্রাণ, ভূমি, কৃষি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সকলের কাছে ও রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আমাদের প্রশ্ন তারা এ বিষয়ে তাদের সমস্ত পরিকল্পনা শ্বেতপত্র হিসাবে প্রকাশ করুন। রাজ্যের মানুষের কাছে আমাদের আবেদন, “নদী ভাঙ্গন একটি ভয়াল প্রাকৃতিক বিপর্যয় যা মানুষের অবিমিশ্রকারীতায় মাত্রা ছাড়া রূপ পেয়েছে” এ ব্যাপারে তারা সজাগ হোন, আন্দোলন গড়ে তুলুন। কারণ নদীর ভাঙ্গনে মাইলের পর মাইল এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, সাথে করে নিয়ে যায় মানুষের ভিটে, মাটি, জীবিকা, জীবন, আত্মপরিচয় এবং তাদের একমাত্র পরিচয় হয় তাঁরা ইকোলজিকাল রিফিউজি, এবং সেখানে কোন কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের সরকার চূপ করে থাকতে পারেন না। আমরা তা হতেও দিতে পারি না।
একই রকম ভাবে মাথাভাঙ্গা, চূর্ণীর মতো নদীর দূষণ, এনক্রোচমেন্ট, বাংলাদেশের থেকে ক্রমাগত দূষণ ও অবৈজ্ঞানিক বাঁধ নির্মান করার কারনে জলের অভাবেও আজ মৃতপ্রায়। এই সব নদীকে বাঁচানোর জন্য স্থানীয় মৎস্যজীবিদের নিয়ে একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা রচনা করুক সরকার এবং রাজ্যের বার্ষিক আর্থিক পরিকল্পনায় নদীভাঙ্গন ও মৃতপ্রায় নদীর পুনরুজ্জীবন যেন বিশেষ গুরুত্ব পায় এটাই আমাদের দাবী।
১৮). গ্রীন সিটি মিশন ও শহরের সবুজতা:–
শেষে আমরা একটা একটি বিশেষ সরকারি প্রকল্পের কথা বলবো, আর তা হলো গ্রীন সিটি মিশন। এটি একটি প্রচুর সম্ভাবনাময় ও অত্যন্ত সময়োপযোগী প্রকল্প। নগর ও নগরায়ন থেকে তৈরী হওয়া দূষণ, তাপ, জলের অপচয়, অতিরিক্ত শক্তি ব্যয়, সবুজ ধ্বংস ও জৈববৈচিত্র্য হ্রাস এসবকে রোধ করে নাগরিক উন্নয়ন রূপায়নের এটা একটা বড় পথ হতে পারে। তবে সেটা তখনই সম্ভব, যখন সব রকম পরিবেশ বিধি, নীতি ও পরিবেশ বিজ্ঞান ও কারিগরিকে আশ্রয় করে এই পরিকল্পনাগুলি রচিত হবে। আমরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করে চলেছি গ্রিন সিটি মিশনের অধীনে রাস্তার সৌন্দর্যায়ন, ফুটপাথ বাঁধানো, ফুটপাথ বাঁধাতে গিয়ে বড় গাছ কেটে বাহারি গাছ লাগানো, উঁচু ভেপার আলো লাগানো এসব করা হচ্ছে যার কোনোটাই পরিবেশ মুখি নয়। ঠিক তেমনই খালি কিছু এলইডি লাইট লাগিয়ে দিলেই যেমন গ্রীন সিটি হয়ে যাবে না। আমরা এই দাবী জানাচ্ছি যে গ্রীণ সিটি মিশন রূপায়নের মূল পরিকল্পনা শ্বেতপত্র হিসাবে প্রকাশ করুক সরকার ও এই পরিকল্পনা রূপায়নের ক্ষেত্রে জেলাভিত্তিক ভাবে সকল সঠীক দক্ষতা সম্পন্ন সংস্থা ও এন-জি-ও গুলিকে যুক্ত করুক। এবিষয়ে সরকারের কাছে একটি পূূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট আমরা জমা দিতে পারি। তবে এ বিষয়ে সরকারকেও সদর্থক ভূমিকা পালন করতে হবে।
১৯). কৃষিজমিতে দূষণ রোধ:
অবিলম্বে কৃষিজমি ও বাগিচা থেকে বিপুল কীটনাশক ও অজৈব রাসায়নিক সারের বহুল ব্যবহার এবং জনজীবনে ও বাস্তুতন্ত্রে তার মারাত্মক কুপ্রভাব এড়ানোর জন্যে ব্যাপক হারে জৈব চাষ ও জিরো বাজেট ফার্মিং শুরু করা দরকার। এবিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। সরকার এবিষয়ে তার দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করুন।

পরিশেষে আমরা একথাই বলব উপরিউক্ত বিষয় গুলি এবং এই প্রকার আরও বিষয় যা হয়তো এখানে তুলে ধরা গেল না কিন্তু মানুষের মধ্য থেকে উঠে আসবে, এ সবই সরকার ও সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরাই খালি আমাদের কাজ নয়। আমাদের দাবী এ সমস্যাগুলির সমাধানের জন্যে সরকার কি ভাবছেন তা আমাদের লিখিতভাবে জানতে চাইতে হবে। পশ্চিমবঙ্গে পরিবেশ- বান্ধব অর্থনৈতিক পরিকল্পনা রূপায়নের জন্য বিশেষজ্ঞর অভাব নেই। সরকার সে সব বিশেষজ্ঞ, পরিবেশ, মানবাধিকার কর্মী, স্কুল কলেজ শিক্ষক, ছাত্র, পঞ্চায়েত ও পৌরসভা এবং নির্দিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে পৃথক পৃথক কমিটি তৈরী করুন যারা পৃথক পৃথক ভাবে বিষয়গুলির উপর কাজ করবেন। রাজ্যের পরিবেশ রক্ষায় সংগঠিত ও সাধারণ মানুষের উদ্যোগ কখনও হয়নি। আমরা চাই সমস্ত সাধারণ মানুষ এই উদ্যোগকে সমর্থন করুন ও সরকার এটিকে সদর্থক পদক্ষেপ হিসাবে গ্রহণ করুন। অর্থ কোনভাবেই এর প্রতিবন্ধকতা হতে পারে না। কারণ আমরা জানি পশ্চিমবঙ্গের প্রচুর ক্লাব আর্থিক অনুদান পায় সরকারের কাছ থেকে। পরিকল্পনা রূপায়নে ইচ্ছে থাকলে এই একই অর্থে ক্লাবগুলির কর্মীদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী একাজে ব্যবহার করা যাবে। পরিবেশমুখি অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল এই প্রাথমিক খরচের বোঝাকে অচিরেই হাল্কা করে দেবে।ক্রমবর্ধমান বিশ্বোষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের সময় দাঁড়িয়ে এটা যুগের দাবী যা আমরা কেউ অস্বীকার করতে পারি না।
পরিশেষে বলি মানুষের ন্যূনতম চাহিদা, পরিস্কার হাওয়া, জল, মাটির। এবং যতক্ষণ না তা পূর্ণ হচ্ছে যে কোন উন্নয়নের মডেলই ব্যর্থ।

পরিবেশ সংক্রান্ত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম Friends of Nature and Natural Resources এবং সংগঠন Friends of Wetlands and Wildlife এর পক্ষ থেকে ড: অমিতাভ আইচ দ্বারা লিখিত ও শ্রী সমীর বসু সম্পাদিত এই বিষয়টি পরিবেশ আন্দোলনে বিনামূল্যে প্রচার, সই ও সমর্থনের মাধ্যমে ডেপুটেশনের জন্য মুদ্রণ যোগ্য।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close